Wednesday, May 16, 2012

কুমীর ও বানর


Translated by Salty  from Vikram Seth's poem "The Crocodile and the Monkey" from his book "Beastly Tales from here and there. "  In case you are unable to view it in Bengali font, please download Avro Bengali Font from here .


গঙ্গা বক্ষে নদীর তটে , সবচেয়ে সবুজ দ্বীপে

কুরুপ নামের কুমীরটি থাকতো মহা সুখে।

খয়েরী সবুজ গায়ের রঙে , মুচকি ঠোঁটের হাসিতে

কোদাল পায়ের আঁশাল গায়ে , চেহারা রাশভারিতে।



ছোটো খাটো, পুঁটি শুঁটি

দেখেও, দেখে না সে

শুশুক কাছিম, মোটা মুটি

মাছের জন্য থাকতো বসে।

সম্মুখ পানে থাকলে তারা

ছড়িয়ে, ভারী জলের ধারা ;

সাঁতরে যেতো নীরব স্বরে

ব্যাঙ ব্যাঙ্গাচি যেমন করে ;

যেন, মস্ত একটা কাঠের গুঁড়ি

দিচ্ছে জলে হামাগুড়ি।

ঘাপটি মেরে তার পাশে পাশে

এক হাত দূরে সাঁতরে এসে ;

দন্ত ভরা হাস্য মুখে

এক ঝটকায় ঘাড়টি ধরে।

মটাৎ করে ঘাড়টি ভেঙে

মহৎ খুশির রঙে, রাঙে ।

সদ্যমৃত খাবার ধরে

যত্নসহে টানে ঘাড়ে ;

টেনে আনে বউয়ের কাছে

একলা যে বউ, বসে আছে ।

ছোট্ট একটা টুকরো ছিঁড়ে

কুরুপ খায় স্বপ্ন নীড়ে ;

সিংহভাগটি বউয়ের পেটে

আস্তানা নেয় চেটে পুটে ।



নদীর তীরে সারি সারি

আম্র কুঞ্জ ভারী ভারী ।

নিকট বন্ধু বানর , তার ঐ কুঞ্জে ঘোরা ফেরা

কাটছে কুমীর নিচে সাঁতার , দেখতে পেলেই ব্যস্ত সাড়া ।

মুঠো মুঠো আমের বৃষ্টি

হলুদ, পাকা খুবই মিষ্টি;

গ্রীষ্ম কালের এই মহা ভোজ

হৈচৈ রব, সদাই রোজ।

“কুমীর, তোমার বউকে সেলাম

আমের মস্ত রসিক পেলাম ;

গ্রীষ্মের এই দাবদাহে

মূর্ছা গিয়ে আম্র শোকে

কোনোদিন পরবে না সে

কুমীর যেন বলে আসে “


কুরুপ শুনে

উপর পানে

চক্ষু মেলে ঈষৎ হাসে ;

“প্রিয় বানর, সবার শেষে,

ফল নয় ত, প্রেমের তরে

মিষ্টি মোদের দিচ্ছ ছুঁড়ে ।

বিরামহীন ভালবাসার , তোমার নেইকো কোনও রাশ

শুকিয়ে দিলে চোখের জল, ফুটল বৌয়ের মুখে হাস ।“

(অর্ধ সত্য বটে , উপরুক্ত পঙক্তি দ্বয় ।

প্রেমেও যেমন

আমেও তেমন

করেছে বৌয়ের হৃদয় জয় । )


শ্রীমতী কুমির, কোন একদিন

আমের অরুচি হয়েছে সঙ্গীন ।

করুন চোখেতে

সে, নরম হাসিতে ;

আদুরে গলায়

কুরুপেরে কয়


“ প্রিয় আঁশ বর ,

যবে থেকে মোরে করেছ বিয়ে

মন ভরিয়েছ সব কিছু দিয়ে

শুশুক কাছিম, মাছ আম আরও কত কি ।

সামনে মোদের বিবাহ বার্ষিকী ।

নিয়ে এস খানে , এক ভালো উপহার

ধরেছে সাধ এখন আমার ;

আখ হোক কিম্বা গুঁড়ো চিনি

অথবা ফলের চেয়েও মিষ্টি জানি ,

বন্ধু বানরের হৃদয় খানি

ইচ্ছে করছে যে খেতে এখনি।“



কুরুপ চমকায় , বলে , “সেকি?”


“প্রিয়তম , শুরুতেই যদি আমরা দেখি,

প্রেম ভরে যে বুকে

আম দিচ্ছে আমাকে ,

তার হৃদয় খানি , ভাবো

কত মিষ্টি হবে , ওগো।“


“তারপর,

কত শত আম খেয়েছে বানর

রসে ভরা কত শাঁস

ঘুরেছে মাঝেতে কত যে বছর

গ্রীস্ম কালের কত যে মাস।

হৃদয়ের যত আনাচে কানাচে

ভরেছে শত অণুতে কণাতে

ঘন রস সব, মিষ্টি মধুর

হৃদয়ে বানরের জমেছে প্রচুর।“


“কিন্তু সোনামণি,

তাকে আমি বন্ধু মানি । “

“আমি সেটা জানি ।

সেজন্যে ওগো,

তুমি যাও শীঘ্রি,

এখানেতে আনো,

যেটা মোর বাড়ী ।


হচ্ছে কষ্ট নিতে মোর শ্বাস ।“

“ আসলে ভারী গরম, করেদি বাতাস?”

“না, মিষ্টি খাবার ভীষণ ধরেছে বাস।

তেতো সব ফল , মুখে নেই রুচি

হৃদয় বানরের খেলে তবে বাঁচি ।

নিয়ে এস তাকে , আমার কুরুপ সোনা

বৃথা তুমি আর দাঁড়িয়ে থেকো না।

নাহলে দেখতে আর পাবে না আমাকে

তেতো মনে যাব চলে ,পরলোকে ।“


কুরুপেরে দেখে বানর খুশি ভারী

নেচে কুঁদে করে কিচিরি মিচিরি।

ডাল থেকে ডালে

খুশি হয়ে দোলে ;

ছুঁড়ে ছুঁড়ে ফেলে আম,

অমুল্য সব, নেই তার কোন দাম।

“বন্ধু, তুমি আম খেয়ে যাও

আর বাকি যাকিছু , সব বৌকে গিয়ে দাও ।

অমৃত ভরা আছে

জীবন্ত সব গাছে ।

এই সব আম কোথাও পাবেনা ,

হলুদ পাকা, এ হল আমের খাজানা। “


চোখ দুটো তার তুলে

হাল্কা হেসে

কাছে ঘেঁসে

কুরুপ তখন বলে ,

“বানর, তোমার মনে প্রভুত দয়া ।

কিন্ত, আজ কিছু মনে করোনা ভায়া ,

বসে আমাদের পাশে

খাবে তুমি আজ এসে।

দেখাব তোমায় সেই সুন্দরী

করেছ মিষ্টি জীবন যার ভারী ;

একবার যদি হও পরিচিত ,

বুঝবে, আমার জীবনে তার মানে কত ।

ধারালো নখের কোমল আঁকড়ে

যখন ধরবে তোমায় আদরে ;

(যেন) ধনুকের থেকে ছুটে আসা তীরে

বিঁধবে হৃদয় মাঝারে।

আর, রাখো যদি তার চোখে চোখ

শুভ্র দরজা খুলবে সামনে, দেখবে স্বর্গলোক।

আজ দেখাতে চাই

মোদের কৃতজ্ঞতা

ভাগ করতে চাই, তাই

নৈশাহার আর বন্ধুত্বতা । “



“প্রিয় কুরুপ , প্রিয় কুমির , সে কি করে হয়?

তুমি চলো জলে

দ্বীপ হতে দ্বীপে

আমি চলি গাছে

ডাল থেকে ডালে

সাঁতরাতে যে পারিনা আমি, জলে করি বড় ভয় ।

তোমার দ্বীপ বড় দুরে তাছাড়া ,

যাব কোনোদিন, যদি নাও পাই ভাড়া ।“


“ভাবো শুধু মিছে মিছে, উঠে পড় মোর পীঠে

বস্তা ভর্তি আমের থেকে ভারী নও তুমি বটে । “


উষ্ণ এই আমন্ত্রনে

বানর মহাখুশী মনে

আমের বস্তা সাথে নিয়ে

নেমে আসে তরতরিয়ে।


আধা রাস্তা যাবার পর

কুমির বলে, “হে বানর,

জলে, আমগুলো সব ফেলো ধরে । “

“সেকি? এই উপহার ত যাচ্ছে তোমার ঘরে !”


“তুমি নিজেই এক পরম উপহার ।“

মোটা গলায় বলে কুমির, নেই তো তাতে ধার ।


“বন্ধুবর, তোমার ব্যাবহার সত্যি মহান ,

এমন নয় যে , স্ত্রী খুব বেশী খান ।

আজকে তবে আমি নিশ্চিত

ফল খাবে না সে, হে বানর মিত।

তবে, আমার একটা প্রশ্ন ছিল

বুকে তোমার , কি আছে ত বল ?

আমের রসে ভরা ,তোমার সকল শিরাধারা ,

হৃদয়েও কি বইছে সেই একই রসের ধারা ?”


শুনে বানর চমকে ওঠে;

“আজব তোমার প্রশ্ন বটে! “

“আসলে , অধিক রসে যদি হয় ভোজন নষ্ট ?

বৌয়ের আবার বদ হজমের আছে ভীষণ কষ্ট ।“


“অধিক রস কোথায় হয়?

”ওইটাতে , যেটা তোমার হৃদয়। “

“কি বললে, আমার হৃদয় ?”

“ঠিক শুনেছ, তোমার হৃদয়।“


ঈষৎ কুঁচকে ভুরু

কুরুপ করে শুরু,

“বল, কি পছন্দ তোমার নিয়তি ?

গঙ্গাজলে ডুবে মরতে ,

নাকি,

আমার বাড়ির খাদ্য হতে ?

বন্ধু তুমি, তাই নিচ্ছি আগেই সম্মতি।


এই না বলে, কুমির ডুব দেয় জলে।

“আরে দাঁড়াও; ভাবতে দাও, এখনি যেও না চলে।

মরবো ডুবে

নাকি চডবো শূলে

মরণ স্থলে

নাকি গভীর জলে ?

কুমির, বন্ধু তুমি আমার যখন

জেনো , যে কোন পথ

হাসি মুখে , করব আমি বরণ ।

কিন্তু আমার কাছে সবচেয়ে মানে বেশী

তোমার বৌয়ের গালভরা হাসি

আর মনের মধ্যে খুশী ।

ভদ্র মহিলা হবেন স্তম্ভিত

শোকে বাকহীনা, সম্পূর্ণ বিস্মিত ;

পাঁজর যখন সরাবে

দেখতে তখন পাবে

বুকের মধ্যে নেই যে হৃদয়।

এই কথা ভেবে ভারী ভয় হয়।

এত দিলে তাড়া আমায়

যাবার সময় পেলাম না হায়;

শয়ন কালে, রাখি যেথায়

গাছের ফাঁকে, ঢেকে পাতায়,

যকৃত আর আমার হৃদয়

চাটনি , সঙ্গে কাফলিঙ্ক দ্বয়

অর্ধেক ঘিলু , নখের ডগা

আর আস্ত একটা লেজের আগা

ঘুম শেষে যেই চক্ষু মোচন

অমনি পেলাম (তোমার ) নিমন্ত্রন ।

একটু আগে বললে তুমি

ডাঙ্গায় গিয়ে,

হৃদয় নিয়ে

তোমার সঙ্গে আসতাম আমি। “


দেঁতো হাসিটা কুরুপের মুখে

হঠাৎ নিভে, ফের ওঠে জেগে ।

“কেমন বকানি বউ দেবে যে আমাকে,

বানর,বানর বাঁচাও আমাকে। “


গম্ভীর বানর, হাত রেখে মুখে

বলে ওঠে, “ঠিক আছে, তবে।

যদিও গরম ভীষণ আজকে,

সচরাচর করতে দেখবে না আমাকে,

তবুও আমরা যেতে পারি ফিরে

হৃদয় যেখানে রেখেছি লুকিয়ে

পরখ করিয়ে তার মিষ্টির মাত্রা

আবার মোরা শুরু করবো যাত্রা । “


তো, বানরকে নিয়ে পীঠে

কুমীর ফিরে চলে নদীতটে।

কৃতজ্ঞতায় কুমীরের চোখ ভরে আসে জলে ।

এতো দুশ্চিন্তা ভারি

হচ্ছে বড় দেরী

বাড়ীতে ফিরলে , দেরীর জন্য বউ নাজানি কি কি বলে ।

বিনীত স্বরে কুরুপ বলে, “ চলে এসো তাড়াতাড়ি ।“

“ ভায়া, আমি নই দুই নম্বরি ।“

গাছের মগডালে বসে কয় বানর ,

“তোমার আঁশালো বউকে দিও গো খবর।

নিজের কুটিল হৃদয় যেন যত্ন করে খায় ,

যদিবা সেই হৃদয় সে কোথাও খুঁজে পায়।

আমার হৃদয় বুকের মধ্যে বাজছে দুরু দুরু ,

দিবারাত্র চলছে ভালো, যবে থেকে তার শুরু ।

আর, বিদায়ী উপহার তুমি এই নাও ,

একশো পচা আম, আরও একশো ফাও।“


বলে, নীচে কুমীরের শিরে

বানর ছুঁড়ে ছুঁড়ে সব মারে।

আর, কুরুপ চুপ করে থেকে

বানরের দিকে চোখ মেলে রাখে,

দাঁতালো হাসি আজও সেই মুখে

যদিও বুক ভরা তার দুখে।

2 comments:

Shantanu said...

Hi Salty,
I have not read Vikram Seth's work from which you have translated; but then the story is well known. But even then as I was reading your translation I appreciated your choice of words, which brings out the lighthearted mood of the whole piece.
The above words were meant to sound like a literary critic. But then if you ask me frankly - I JUST LOVED IT.
Hope you would continue doing more Bangla translations of literary work in other languages.

Salty said...

Shantanu,
Thank you for visiting the blog and your encouraging comments